পুষ্টিমান বজায় রেখে রান্নার কৌশল

রান্নার সময় আমাদের অসচেতনতার কারণে খাদ্যের অধিকাংশ পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। যার দরুন পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় থাকা সত্ত্বেও পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়। এবং নানা ধরনের জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। তাই সুস্থ থাকার জন্য খাবার রান্নার সময় পুষ্টিমান অটুট থাকে সেদিকে লক্ষ্য রেখে রান্না করা উচিত।পুষ্টি মান অটুট রাখতে কিছু উপায় জেনে নেয়া যাক-

চাল

  • পুরনো চাল ধোয়া বা রান্নার সময় এর পুষ্টিমূল্যের অপচয় কম হয় তাই নতুন চালের চেয়ে পুরনো চালে বেশি পরিমাণ পুষ্টি পাওয়া যায়। নতুন চালে বসা ভাত (মাড় না ফেলে) রান্না করলে পুষ্টিমূল্যের অপচয় কম হয়।

ডাল বা বীজ

  • ডালে থায়ামিন পাওয়া যায়।ডাল রান্নায় বেকিং পাউডার বা বেকিং সোডা ব্যবহারের ফলে থায়ামিন নষ্ট হয়। কাঁচা আম, টমেটো বা টক ফল যোগ করলে ডালে থায়ামিন অপচয় রোধ করা যায় ।
  • ডাল জাতীয় খাদ্যের শর্করা (ভারবাসকোস, স্টাকিওজ এবং রাফিনোজ) সহজে পরিপাক হতে পারে না। পরিপাক না হয়েই বৃহদান্ত্রে প্রবেশ করে এবং অনুজীব এর সংস্পর্শে গ্যাস উৎপন্ন করে। তাই ডাল খেলে অনেকের পেটে ব্যথা হয়ে থাকে। ছোলার ডাল সর্বাধিক গ্যাস উৎপন্ন করে। তবে অঙ্কুরিত ছোলার ডালে শর্করার পরিমাণ হ্রাস পায়। ফলে কম গ্যাস উৎপন্ন হয়। তাই ছোলা রান্নার পূর্বের ১২ ঘন্টার বেশি সময় ধরে ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করে রান্না করা ভালো। মুগ ডাল তেমন গ্যাস উৎপন্ন করে না তাই মুগ ডাল খাওয়া স্বাস্থ্যকর।
  • বিভিন্ন জাতের শিম, মটর, সয়াবিন ডাল, সূর্যমুখী বীজ ইত্যাদি খাদ্যে কতগুলো বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে যা ট্রিপসিন নামক (অগ্ন্যাশয় এনজাইম) এনজাইম কে অক্ষম করে দেয়। ফলে প্রোটিন পরিপাক বাধাগ্রস্ত হয়। উচ্চ তাপে ভালোভাবে সিদ্ধ করলে এই বিষাক্ত উপাদান নষ্ট হয়। তাই এসব বীজ/ ডাল জাতীয় খাদ্য রান্নার সময় ভালোভাবে সিদ্ধ করে নিলে এনজাইম এর ক্রিয়া ঠিক থাকে।
  • কাচা ডালে গলগন্ড সৃষ্টি কারী পদার্থ থাকে। রান্নার সময় ডাল ভালোভাবে সিদ্ধ করে নিলে এই ঝুঁকি কমে।
  • খেসারির ডালে BOAA নামক এমাইনো এসিড থাকে যা ল্যাথারিজম (পায়ের প্যারালাইসিস) রোগ সৃষ্টি করে। তাই খেসারির ডাল দীর্ঘ সময় ধরে গরম পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি ফেলে দিয়ে, সিদ্ধ করে পানি ছেকে রান্না করলে এর ঝুঁকি কমে। তবে দীর্ঘদিন খেসারি ডাল গ্রহণে ল্যাথারিজম হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে।

মাছ

  • মাছে পাওয়া যায় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড যা আমাদের ব্রেন ও চোখের জন্য খুবই উপকারী। এটি স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ।মাছ ভেজে রান্না বা ওভেনে বেক করার ফলে ওমেগা-3 ফ্যাটি এসিড ও প্রোটিন নষ্ট হয়। মাছ না ভেজে মেরিনেট করে রান্না করলে পুষ্টিমান ঠিক থাকে।

মাংস

  • গাঢ় বাদামি বা খয়েরি করে মাংস ভাজা বা ঝলসানোর ফলে বেসিক এমাইনো এসিড নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হালকা ভেজে বা না ভেজে রান্না করলে মাংসের প্রোটিন এর মান ঠিক থাকে।
  • মাংস ও কলিজায় ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায় । কলিজার গন্ধ দূরীকরণের জন্য সিদ্ধ করে পানি ফেলে দেয়ার কারনে এই ভিটামিনের অপচয় হয়। কলিজা রান্নার পূর্বে লেবুর রস মিশিয়ে, সিদ্ধ করে পানি না ফেলে রান্না করলে কলিজার গন্ধ দূর হয় সেই সাথে ভিটামিন বি১২ এর অপচয় হয় না।

ডিম

  • ডিম কোনো ভাবেই কাঁচা খাওয়া উচিত নয়। কাঁচা ডিমের সাদা অংশে এক ধরনের প্রোটিন Avidin থাকে, যা গ্রহণে বায়োটিন এর অভাব হয়। Avidin উচ্চ তাপে নষ্ট হয়। তাই উচ্চ তাপমাত্রায় ডিম ভেজে বা সিদ্ধ করে নিলে এই ঝুঁকি থাকে না।
  • হাঁসের ডিমে ট্রিপসিন ধ্বংসকারী উপাদান রয়েছে যা উচ্চ তাপে নষ্ট হয়। ট্রিপসিন প্রোটিন পরিপাককারী এনজাইম। ভালো ভাবে সিদ্ধ করে/ভেজে খেলে ট্রিপসিন এর কার্যক্ষমতা ঠিক থাকে।

মসলা

  • অতিরিক্ত তেল মসলা পাকস্থলীতে গ্যাস বাড়ায় এবং আলসার রোগীদের ক্ষত নিরাময়ে বিলম্ব করে । তাই গ্যাস্ট্রিক বা আলসার এর লক্ষণ থাকলে কম তেল-মসলায় রান্না করা ভালো।

সবজি

  • সবজি কাটার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নেয়া উচিৎ। কাটার পরে ধুলে পানিতে দ্রবীভূত ভিটামিন বি ও ভিটামিন সি এবং কিছু খনিজ লবণ পানির সাথে মিশে যায়। ফলে খাবারে এসব ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি হয়।
  • কচুর পাতা,মূল বিভিন্ন অংশে ক্যালসিয়াম অক্সালেট থাকে বলে,কচু খেলে গলা চুলকায় এবং দীর্ঘদিন ক্যালসিয়াম অক্সালেট কিডনিতে জমে রেনাল ক্যালকুলি বা কিডনিতে পাথর সৃষ্টি করতে পারে। রান্নার সময় পরিমাণ মতো লেবুর রস দিলে, কচুতে উপস্থিত ক্যালসিয়াম অক্সালেট দ্রবীভূত হয়ে যায়। ফলে খাওয়ার সময় মুখ বা গলা চুলকায় না এবং কিডনীতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমে।

ভিটামিন ও খনিজ লবণ

  • ভিটামিন সি ছাড়া আয়রন দেহে শোষিত হতে পারে না। তাই আয়রন সমৃদ্ধ খাদ্যের-(যেমন:- কচু শাক , রঙিন শাক-সবজি, মাছ,মাংস , শুঁটকি ইত্যাদি) সাথে লেবু বা ভিটামিন সি জাতীয় যে কোন ফল/সবজি খেলে, দেহে সহজে আয়রন শোষিত হয়।
  • ভিটামিন এ,ডি,ই,কে যেহেতু তেল বা চর্বি দ্রবীভূত ভিটামিন। তাই,ভিটামিন এ ভিটামিনসমৃদ্ধ খাদ্য(যেমন: গাজর, রঙিন শাকসবজি, কলিজা), ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ খাদ্য-(যেমন: তেল বা চর্বি যুক্ত মাছ, সামুদ্রিক মাছ, মাছের কলিজা, ডিম, শুঁটকি মাছ ইত্যাদি), ভিটামিন ‘ই’ সমৃদ্ধ খাদ্য (যেমন: উদ্ভিজ তেল, লেটুস পাতা, কিছু সবুজ শাক, বিচি), ও ভিটামিন ‘কে’ সমৃদ্ধ খাদ্য (যেমন: সবুজ শাক-সবজি, কলিজা) রান্নার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল ব্যবহার করলে, এই ভিটামিনগুলো দেহে সহজে শোষিত হতে পারে।
  • ভিটামিন সি অক্সিজেনের সংস্পর্শে অনেকক্ষণ থাকলে অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যায়। সালাদ এর জন্য টমেটো, শসা ও কাঁচা-মরিচ অনেকক্ষণ আগে থেকে কেটে না রেখে, খাওয়া শুরুর ১-২ মিনিট আগে কেটে খেলে ভিটামিন সি এর অপচয় কম হয়।
  • রান্নায় তামার চামচ বা তামার পাত্র ব্যবহারে ভিটামিন সি প্রচুর অপচয় হয়। স্টিলের পাত্র বা চামচ ব্যবহারে এই অপচয় রোধ করা যায়।
  • যে কোন শাক সবজি সিদ্ধ করে পানি ফেলে দিলে খনিজ উপাদানের অপচয় হয়। পানি না ফেলে রান্না করলে খনিজ উপাদানের অপচয় রোধ করা যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *