পেপটিক আলসারে করনীয়

পেপটিক আলসার পরিপাকতন্ত্রের অন্যতম সাধারণ রোগ। পাকস্থলী-তে HCL acid অধিক নিঃসরণ এর ফলে পাকস্থলী-তে/খাদ্যনালীর মিউকোসাল আস্তরনে ক্ষত সৃষ্টি হয়, একে আমরা পেপটিক আলসার বলে থাকি। সাধারণত, ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডেনামে আলসার বেশি হয়ে থাকে। পাকস্থলী এবং অন্ননালীতেও আলসার হয়। পাকস্থলীতে ক্ষত হলে তাকে বলা হয় গ্যাস্ট্রিক আলসার,এক্ষেত্রে এসিড নিঃসরণের পরিমানে স্বাভাবিকের চেয়ে খুব বেশি তারতম্য হয় না। পাকস্থলীতে এসিডের নিঃসরন বেশি বৃদ্ধি পেলে ডিওডেনাল আলসার হয়ে থাকে। ৮০-৮৫% হয় ডিওডেনাল আলসার , ৬০%হয় গ্যাস্ট্রিক আলসার।

পেপটিক আলসার এর কারনঃ

বিভিন্ন কারনে পাকস্থলীতে এসিড নিঃসরণ বৃদ্ধি পায় ফলে পাকস্থলী, ডিওডেনাম ও অন্ননালিতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে আলসার হয়ে থাকে।

  • পাকস্থলীতে ও ডিওডেনামে acid ও pepsin secretion ও mucosal resistenceএর ভারসাম্যহীনতার ফলেই সাধারণত আলসার হয়ে থাকে।
  • স্নায়ূবিক চাপঃ উত্তেজনা, মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা , ভয়ের কারনে পাকস্থলীতে এসিডের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায় ফলে আলসার হয়।
  • মশলাযুক্ত খাবারঃ অধিক ঝাল মশলাযুক্ত খাবার পাকস্থলীতে এসিডের ক্ষরন বাড়ায়, ফলে আলসার হতে পারে।
  • অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসঃ পাকস্থলীতে নিঃসৃত HCL Acid খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা/অসময়ে খাবার গ্রহনে, পাকস্থলী খালি থাকায় এতে নিঃসৃত এসিড এর গাত্রে ক্ষত সৃষ্টি করে।
  • ধুমপানঃ অতিরিক্ত ধুমপানে পাকস্থলীতে এসিডের ক্ষরন বৃদ্ধি পেয়ে আলসার হয়ে থাকে।
  • উত্তেজক খাদ্য গ্রহনঃ মদ্য পান, ক্যাফিন গ্রহনে পাকস্থলী তে এসিডের ক্ষরন বৃদ্ধি পায় ফলে আলসার হতে পারে।
  • ঔষধঃ দীর্ঘদিন NSAIDS গ্রহন, aspirine, স্টেরয়েড, বাতের ঔষধ/গেঁটে বাতের ঔষধ গ্রহনে আলসার হতে পারে।।
  • ব্যাকটেরিয়া সংক্রঢমণঃ Dr Barry Marshal সম্প্রতি আবিষ্কার করেন (Helicobacter pylori) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনের কারনে পেপটিক আলসার হয়। ধারনা করা হয় প্রায় ৬০% পাকস্থলীতে আলসার ও ৯০% ডিওডেনামে আলসার, Helicobacter pylori ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনের হয়ে থাকে। এছাড়া,নিকট আত্নীয় দের মধ্যে আলসার রোগীর সংখ্যা বেশী হতে দেখা যায় বলে, এই রোগে বংশগত প্রভাব রয়েছে বলে ধারনা করা হয়।

উপসর্গঃ

আলসার পৌষ্টিকনালীর যেখানেই হোক, প্রায় একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। যেমনঃ

  • বুক-জ্বালা, পেট ব্যথা, পেট মোচড়ানো, বমি ভাব, কখনো কখনো বমি হয়ে থাকে।
  • খাদ্য গ্রহনের ১-৩ ঘন্টার মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগে। এ সময় পেটে জ্বালাপোড়াসহ তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।এ অবস্থায় অ্যালকালি বা খাদ্য গ্রহনে প্রশান্তি পাওয়া যায়।
  • খালি পেটে বেশি ব্যথা অনুভূত হয়।

জটিলতাঃ

  • পাকস্থলী প্রাচীরে ছিদ্র হলে, রক্ত ক্ষরন হয়, তীব্র ব্যথা হয়, পাকস্থলী নিস্তেজ হয়ে পেট ফুলে উঠে। জটিল অবস্থায় অপারেশনের প্রয়োজন হয়।
  • পরবর্তীতে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।বিশেষ করে বয়স্কদের এই ঝুঁকি বেশি থাকে। চিকিৎসাঃ

ঔষধঃ

  • এসিডের ক্ষরন কমানোর জন্য Anticholinergic ঔষধ দেয়া হয় এবং এসিড প্রশমিত করার জন্য antacids দেয়া হয়।

বিশ্রামঃ

আলসার থেকে সুস্থতার জন্য বিশ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ন । সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশে, পুরোপুরি বিশ্রাম রোগীর পরিপাকতন্ত্রের কার্যকলাপ সঠিক ভাবে চলতে দারুন কার্যকরী।দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য শারীরিক এবং মানসিক বিশ্রাম সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পথ্যঃ

ব্লেন্ড/নরম তরল/অর্ধতরল অল্প আঁশ যুক্ত খাদ্য আলসার রোগীর জন্য আদর্শ পথ্য । পেপটিক আলসারের ৪টি পর্যায়/অবস্থা অনুসরন করে পথ্য দেয়া হয়,যাতে রোগের তীব্রতা কমে আসে।

  • ১ম ধাপে, রোগীর তীব্র ব্যথা থাকে।এ অবস্থায় রোগীকে অল্প ঠান্ডা দুধ প্রতি ঘন্টায় ৫০-৬০ গ্রাম(সর্বোচ্চ ১০০গ্রাম)পরিমানে দেয়া যায়। দুধের প্রোটিনের দারুন বাফার ক্রিয়া এ অবস্থায় রোগীকে প্রশান্তি দেয়। এসিড প্রশমনে সহায়ক প্রচুর তরল /পানি দিতে হয়। সব ধরনের আঁশ যুক্ত খাবার রেস্ট্রিক্টেড করা হয়।যেমন,শাক,খোসা সহ ফল,লাল আটা, বীচি ইত্যাদি । ব্যথা কমে গেলে,অল্প করে সহজ পাচ্য খাবার-পুডিং,কাস্টার্ড,নরম সিদ্ধ ডিম,সিদ্ধ সবজি,জাউভাত দেয়া যায়।
  • ২য় ধাপে,এ পর্যায়ে রোগীকে দৈনিক ৬-৮ বার অল্প পরিমাণে খাবার দেয়া হয়। সব ধরনের দুগ্ধজাত খাদ্য দেয়া যায়। বেশি গরম বা ঠান্ডা খাবার গ্রহণ করা যাবেনা।উদ্ভিজ্জ আঁশ যুক্ত খাবার -শাক,বাদাম,ফল,তেলবীজ এবং গ্যাসের উদ্রেককারী সবজি (ফুলকপি, বাঁধাকপি) খাদ্যতালিকায় রাখা যাবেনা। অতিরিক্ত এসিড ক্ষরনকারী সব ধরনের ক্যাফেইন, নিকোটিন, মশলাযুক্ত খাবার, তেলে ভাজা খাবার পরিহার করতে হবে।
  • ৩য় ধাপে,এ পর্যায়ে দৈনিক ৬বার খাবার দেয়া হয়। প্রতিবারে খাবার এর পরিমান বাড়ানো যায়।
  • ৪র্থ ধাপে, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাদ্য দেয়া যায়। অবস্থার উন্নতি রং সাথে নরম সিদ্ধ আটার রুটি,ডিম সিদ্ধ,কম মশলাযুক্ত মাছ, মুরগির ঝোল,নরম সিদ্ধ ডাল।

গ্রহনযোগ্য খাদ্য ও বর্জনীয় খাদ্য

গ্রহনযোগ্য খাদ্যবর্জনীয় খাদ্য
পানীয়: সবধরনের দুগ্ধজাত পানীয়, পাতলা চাপানীয়: কড়া চা, কফি,অ্যালকোহল, কার্বোনেটেড ড্রিংকস।
শস্য: নরম রুটি,ভাত,চিড়া, মুড়িশস্য: পরোটা, লুচি,ভূষিযুক্ত আটার রুটি
ডিম: সিদ্ধডিম: ভাজা
তেল/চর্বি: পরিমাণমতোতেল/চর্বি: ঘি/ডালডা/তেলে ভাজা খাবার
ফল: খোসা ছাড়ানো ফল,কলা, পেঁপেফল: খোসা সহ ফল, টক ফল ।
মাছ/মাংস: ভালভাবে সিদ্ধ নরম মাছ,মাংস।মাছ/মাংস: চর্বিযুক্ত মাছ,মাংস।
ডাল: ভালভাবে সিদ্ধ চটকানো ডালডাল: মটর, ছোলা ভাজা, চটপটি,বাদাম।
সবজি: লাউ, ঝিঙ্গা, পেঁপে, আলু, গাজর(সিদ্ধ)সবজি: আঁশ যুক্ত সবজি-বাধাকপি, মটরশুটি, ডাটা শাক
সব ধরনের দুগ্ধজাত খাদ্য।চকলেট,ক্রীম, মশলাযুক্ত খাবার

পরামর্শঃ

  • কোনো ভাবেই খাদ্য উত্তেজনা/তাড়াহুড়া করে খাওয়া উচিত নয়। খাদ্য ধীরে ধীরে ভালো ভাবে চিবিয়ে খাওয়া উচিত। আলসার কে ‘Hurry, worry and curry’ disease বলা হয়, এই তিনটির প্রভাবে আলসার বাড়ে। তাই এই তিনটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী।
  • দৈনিক ৫-৬বার অল্প পরিমাণে খাবার গ্রহণ করা,যাতে পরিপাক ক্রিয়া সহজ হয় এবং পাকস্থলী খালি না থাকে।
  • যেসব খাবার গ্রহনে এসিড নিঃসরণ বাড়ে /পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহ বাড়ে সেসব খাবার পরিহার করতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *