শুঁটকি মাছের পুষ্টি গুন

রোদে শুকিয়ে মাছ সংরক্ষণের পদ্ধতি আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। এই শুকনো মাছ কে আমরা শুঁটকি মাছ বলে থাকি। সাধারণত কাঁচা মাছে লবন মাখিয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে শুঁটকি প্রস্তুত করা হয়। এতে মাছের জলীয় অংশ শুকিয়ে যায় এবং অনুজীব বা জীবাণু থাকে না,ফলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। শুঁটকি মাছ অতি জনপ্রিয় খাদ্য। যদিও গন্ধের জন্য অনেকে শুঁটকি তেমন পছন্দ করে না। তবে, শুঁটকি মাছ সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর ।

শুঁটকির পুষ্টি গুণঃ

সমপরিমাণ কাঁচা মাছের চেয়ে শুঁটকিতে প্রোটিন, ভিটামিন ‘ডি’ এবং অন্যান্য খনিজ উপাদানের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।

লো ক্যালোরি সহ উচ্চ প্রোটিন:

শুঁটকি প্রোটিন এর একটি সমৃদ্ধ উৎস, এতে ৭৫-৮০% প্রোটিন থাকে। এতে উপস্থিত অ্যামিনো এসিড গুলো ডিমের অ্যামিনো এসিডের সাথে (Livsmedelsverket 1996) তুলনা করে, দেখা গেছে শুকনো মাছে উপস্থিত প্রোটিনগুলি উচ্চমানের হয়। শুকনো মাছ কম ক্যালোরিযুক্ত প্রোটিনের অন্যতম ভাল উৎস ।১০০ গ্রাম শুকনো মাছে ৩০০ ক্যালরিযুক্ত প্রায় ৮০ শতাংশ প্রোটিন পাওয়া যায়।অপর দিকে, গরুর মাংসে কম প্রোটিন এবং ক্যালোরি দ্বিগুণেরও বেশি থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে শুঁটকি মাছ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রোটিন সমস্ত জীবের জন্য অ্যান্টিবডি এবং এনজাইমের মূল উৎস এবং অন্যান্য শারীরিক উপাদানগুলির একটি প্রয়োজনীয় অংশ তৈরি করে ।
এছাড়া নখ, পেশী ও চুলের গঠনের অন্যতম উপাদান প্রোটিন। যারা প্রোটিন বা আমিষ এর অভাব জনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে এমনকি, যারা দুধ খেতে পারে না বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে, তাঁরা প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসেবে খাদ্য তালিকায় শুঁটকি রেখে প্রোটিন এর চাহিদা পূরণ করতে পারে।

ভিটামিন ও খনিজ লবণ:

প্রায় সব ধরনের শুকনো মাছে প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং খনিজগুলির পরিমাণ বেশি থাকে এবং সামান্য পরিমাণে কোলেস্টেরল থাকে।রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করার ফলে, শুঁটকিতে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। এছাড়া অল্প পরিমাণে অন্যান্য ভিটামিন ও পাওয়া যায়। মানব দেহের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজ উপাদান যেমন- আয়রন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও আয়োডিন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, লৌহ ও আয়ডিনের অন্যতম উৎস শুঁটকি । ছোট চিংড়ি শুঁটকিতে প্রচুর আয়রন পাওয়া যায়, যা গর্ভবতী নারীদের রক্তস্বল্পতা দূরীকরণে দারুণ ভূমিকা পালন করে। আয়োডিন বিভিন্ন হরমোন জনিত সমস্যা দূর করে। শুঁটকি হতে প্রাপ্ত ভিটামিন ডি, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম দাঁত , হাড় ও নখের গঠনে সাহায্য করে। খাদ্য তালিকায় নিয়মিত শুঁটকি রাখতে পারলে দাঁত ও হাড়ের সমস্যা দূরীকরণ সম্ভব।

ফ্যাট:

শুঁটকিতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম থাকে, ফলে শুঁটকি হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি হ্রাস করে।

কোন বিশেষ ধরনের শারিরীক জটিলতা না থাকলে একজন মানুষ প্রতিদিন ৩০ গ্রাম পর্যন্ত শুঁটকি খেতে পারেন। শুঁটকি সহজলভ্য এবং পুষ্টি গুণের দিক থেকে বেশ উপকারি। সর্বোপরি, শুঁটকি মাছ ভিত্তিক ডায়েট দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের (প্রতি ১০০ গ্রাম) শুঁটকিতে প্রোটিন ও খনিজ লবণের ও ক্যালরির পরিমাণ:

ছোট চিংড়ির শুঁটকি: ৬২.৪ গ্রাম প্রোটিন, ৩৫৩৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩৫৪ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২৮ গ্রাম লৌহ ও ২৯২ ক্যালরি।

ছুরি শুঁটকি: ৭৬.১ গ্রাম প্রোটিন, ৭৩৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭০০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৪.২ মিলিগ্রাম লৌহ, ৩৮৩ ক্যালরি।

টেংরা শুঁটকি: ৫৪.৯ গ্রাম প্রোটিন, ৮৪৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪০০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৫ মিলিগ্রাম লৌহ ও ২৫৫ ক্যালরি।

লইট্টা শুঁটকি: ৬১.৭ গ্রাম প্রোটিন, ১৭৮১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২৪০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২০ মিলিগ্রাম লৌহ ও ২৯৫ ক্যালরি।

ফাইস্যা শুঁটকি: ১১ গ্রাম প্রোটিন, ১১৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪৭৮ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ১৮ মিলিগ্রাম লৌহ ও ৩৩৬ ক্যালরি।

শুটকি খাওয়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ /সতর্কতা:

  • শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের সময় প্রচুর লবণ দেওয়া হয়। তাই যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে তারা শুঁটকি খাওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম।
  • বাত ও কিডনির রোগীদের শুঁটকি পরিহার করা উচিত।
  • যাঁদের কিডনিতে ক্যালসিয়াম পাথর হওয়ার ঝুঁকি আছে, তাঁরা শুঁটকি এড়িয়ে চলা জরুরী।
  • ইদানীং শুঁটকি সংরক্ষণে ক্ষতিকর কীটনাশক ডিডিটি-জাতীয় উপাদান দেওয়া হয়।ডিডিটি মিশ্রিত শুঁটকি গ্রহণ করলে লিভার ক্যান্সার, কিডনি ড্যামেজ, চর্ম রোগ, খোস-পাঁচড়া প্রভৃতি জটিল সমস্যা হতে পারে। তাই শুঁটকি খাবার আগে বা কেনার আগে ভালো ভাবে জেনে নিতে পারলে ভালো হয়। যদি সম্ভব হয় নিজেই ঘরে শুঁটকি বানানো যেতে পারে।বাজার থেকে শুঁটকি কিনে আনার পর গরম পানি দিয়ে খুব ভালোভাবে বেশ কয়েকবার ধুয়ে নিতে হবে।
  • কেনা শুঁটকি কেমিক্যালমুক্ত কিনা নিশ্চিত হতে না পারলে গর্ভবতী মায়েদের শুঁটকি পরিহার করতে হবে।
  • শুঁটকির পুষ্টিমান বজায় রাখতে কম তেল,মশলায় রান্না করতে হবে।
  • বাড়িতে শুঁটকি সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে, শুঁটকি মাঝে মাঝে কড়া রোদে দিতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *