সুপারফুড কিনোয়া

কিনোয়া একটি বর্ষজীবী গুল্ম জাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর উদ্ভিদ অনেকটা শাক পাতা এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এর ভক্ষণযোগ্য বীজের জন্য বর্ষজীবী শস্য হিসেবে চাষ করা হয়। ক্ষুদ্রাকার বীজগুলো গোলাকার বা ডিম্বাকার, রান্নার ফলে বীজগুলো আকারে প্রায় চারগুণ এবং স্বচ্ছ হয় অনেক টা সাবুদানার মত।

প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে মানুষের খাদ্য হিসেবে এর প্রচলন শুরু হয়, পেরু এবং বলিভিয়ায়।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের 5 বছরের গবেষণা শেষে আমাদের দেশে বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে

 (লালমনিরহাট কুড়িগ্রাম ও পটুয়াখালীতে) এই পুষ্টিকর শস্যের চাষ করা হচ্ছে।

100 গ্রাম কিনোয়াতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান এর পরিমান:

ক্যালোরি 120

পানি 72 %

প্রোটিন 4.4 গ্রাম

কার্বোহাইড্রেট 21.3 গ্রাম

ফাইবার খাদ্য-আঁশ 2.8

ফ্যাট বা চর্বি 1.9

সুগার বা চিনি 0.9

এক কাপ 185 গ্রাম রান্না করা কিনোয়াতে 222 ক্যালরি পাওয়া যায় ।

কিনোয়াতে, সাধারণ শস্যের চেয়ে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস,ফলেট ,তামা ইত্যাদি ভিটামিন ওখনিজ পদার্থ বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়।  এছাড়াও কিনোয়া , ফাইবারের একটি উৎকৃষ্ট উৎস। এবং পর্যাপ্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও  অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ। তাই একে সুপারফুড বলা হয়।

কিনোয়ার স্বাস্থ্য ভূমিকা

দেহ গঠন

কিনোয়া তে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড যা আমাদের দেহের বিল্ডিং ব্লক কথিত প্রোটিন এর অন্যতম গাঠনিক উপাদান। দেহ গঠনকারী খাদ্য হিসেবে কিনোয়া অসাধারণ ।

কিনোয়াতে প্রাপ্ত ভিটামিন ও মিনারেলের স্বাস্থ্য ভূমিকাঃ

-ম্যাঙ্গানিজ বিপাক ক্রিয়ায় এবং দৈহিক বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

-ফসফরাস হাড়ের স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য টিস্যুর রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে।

-তামা হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

-বি ভিটামিনগুলির মধ্যে একটি ফোলেট , যা কোষের ক্রিয়াকলাপ এবং টিস্যু বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ।

-আয়রন মানবদেহে রক্ত কণিকায় অক্সিজেন পরিবহনের কাজ করে।

এছাড়া অন্যান্য খনিজ উপাদান গুলো বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে ব্যবহৃত হয়।

ওজন হ্রাস করেঃ

কিনোয়া তে উপস্থিত কার্বোহাইড্রেট এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম হওয়ায় তা হঠাৎ করে দ্রুত রক্তের গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয় না। যা স্থূলতা প্রতিরোধ  করে। এমনকি,বিভিন্ন গোটা শস্য জাতীয় খাবারের তুলনায় কিনোয়াতে ফাইবারের পরিমাণ বেশি এবং প্রোটিনের পরিমাণ বেশি যা পরিপূর্ণ আহারের অনুভূতি দেয় ,ফলে কম খাবার গ্রহণ করা হয় যা ওজন কমাতে ভূমিকা পালন করে।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করেঃ

কিনোয়াতে ফাইবারের পরিমাণ বেশি, যা মলের পরিমাণ বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

গ্লুটেন মুক্ত স্বাস্থ্যকর ডায়েটঃ

গ্লুটেন অসহিষ্ণু(যেমন সেলিয়াক রোগ) বা গ্লুটেন এলার্জি আছে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে কিনোয়া ডায়েট পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। তাই গ্লুটেন অসহিষ্ণু রোগীদের ক্ষেত্রে গমের উৎকৃষ্ট বিকল্প হতে পারে ।

হূদরোগ ও ডায়াবেটিসঃ

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কিনোয়ার  পুষ্টি উপাদান রক্তে শর্করা এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে।

টাইপ টু ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার হয় না, ফলে দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করে।

পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়, অপরদিকে কিনোয়া অপরিশোধিত খাদ্যশস্য হওয়ায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ধীরে বৃদ্ধি করে। (উচ্চ মাত্রার ফ্রুক্টোজ ডায়েটে , ইঁদুরের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, কিনোয়া গ্রহণের ফলে রক্তের গ্লুকোজ কোলেস্টেরল এবং ট্রাই গ্লিসারাইড এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। কিনোয়া রক্তের ফ্রি ফ্যাটি এসিড হ্রাস করে।)

ফলে টাইপ টু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিনোয়া অসাধারণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতসব স্বাস্থ্য ভূমিকার জন্য কিনোয়া আমাদের খাদ্য তালিকায় একটি পুষ্টিকর সংযোজন হতে পারে। 

সতর্কতা:

কিনোয়াতে কিছু উপাদান রয়েছে যা এর স্বাদ ও স্বাস্থ্যগত ভূমিকায় প্রভাব রাখে  –

স্যাপোনিন -কিনোয়াতে তিক্ত স্বাদ এর জন্য দায়ী। এর উপস্থিতির জন্য কিনোয়া বীজ পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে ভালো করে ধুয়ে রান্না করলে তিক্ত স্বাদ দূর হয়।

অন্যান্য শস্য জাতীয় খাদ্যের মত কিনোয়াতে কিছু অক্সালেট রয়েছে যা আয়রন, দস্তা,ক্যালসিয়াম ইত্যাদি খনিজ উপাদান সমূহ শোষণে বাধা দেয়। তাই সাথে কিছুটা ভিটামিন সি জাতীয় সবজি যোগ করে আয়রনের শোষণ বাড়ানো যেতে পারে।

কিনোয়াতে অক্সাইড অক্সালেট এর পরিমাণ বেশি, যা কিডনিতে পাথর সৃষ্টি করতে পারে, রান্নার আগে ভালো করে ধুয়ে ভিজিয়ে রেখে এর প্রভাব হ্রাস করা যেতে পারে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *