মিষ্টির উপকারিতা ও অপকারিতা

Sweet

মিষ্টি -চিনি, দুধ,ছানা ও আটার/ময়দার সমন্বয়ে তৈরি জনপ্রিয় পুষ্টিকর খাবার। আমাদের দেশের সুপরিচিত কয়েক প্রকারের মিষ্টিঃ রসগোল্লা, রাজভোগ, কালোজাম, চমচম, রসমালাই, প্রাণহরা, সন্দেশ, ছানামুখী, মণ্ডা, বুরিদান, মতিচুর লাড্ডু, আমিট্টি বা আমৃতি, মালাইকারী, কাঁচাগোল্লা।

মিষ্টির পুষ্টি উপাদানঃ

মিষ্টি তৈরিতে দুধ, ছানা ব্যবহৃত হয় ফলে এতে প্রোটিন,ফ্যাট, বিভিন্ন ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। প্রচুর পরিমাণে চিনি/চিনির সিরা ব্যবহৃত হয়, তাই এর ক্যালরীর বেশি অংশ আসে শর্করা হতে।

মিষ্টির উপকারিতাঃ

সবসময়ই আমাদের ধারণা, যারা বেশি মিষ্টি খায় তাদের টাইপ-টু ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি।

কিন্তু এসব স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য শর্করাই যে দায়ী – তা হয়তো না-ও হতে পারে। ‘ঠিক কিভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এই শর্করা’ – তা বের করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখছেন, বিশেষ করে শর্করা উচ্চমাত্রার ক্যালরি সমৃদ্ধ খাদ্যের সাথে খাওয়া না হলে ক্ষতিকর নয়।

  • মিষ্টি তৈরিতে দুধ/ছানা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই, মিষ্টি আমাদের দাঁত ও হাড়ের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • ১০০ গ্রাম রসগোল্লা মিষ্টি তে প্রায় ১৮৬ ক্যালরী থাকে যার প্রায় ১৫৩ ক্যালরী ই আসে শর্করা হতে , যা তাৎক্ষণিকভাবে শক্তি সরবরাহ করে।
  • মিষ্টি খাবার খেলে শরীরে সেরিটোনিন নামের হরমোন ক্ষরিত হয়। এই হরমোন নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে। ফলে, মিষ্টি খাবার খেলে আমাদের মধ্যে সুখ ও আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। এই অনুভূতি শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
  • খাদ্য গ্রহণের পরে সেই খাদ্য হজম করার জন্যে আমাদের পাকস্থলীতে অ্যাসিড ক্ষরণ শুরু হয়। ঝাল বা তেলমশলাযুক্ত খাবার খেলে অ্যাসিড ক্ষরণের পরিমাণ বাড়ে। অতিরিক্ত এসিড ক্ষরণের ফলে পরিপাক ক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এমনকি পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অসুখ দেখা দিতে পারে। মিষ্টিজাতীয় খাবার এই অ্যাসিড ক্ষরণের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এর ফলে পরিপাকক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
  • এছাড়া বেশি পরিমাণে তেলে ভাজা বা মিল খাওয়ার পর শরীরের রক্তচাপ অনেকাংশেই কমে যায়। এই অবস্থায় মিষ্টি জাতীয় খাবার রক্তচাপকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। এবং আমাদের স্বস্তি এনে দেয়।
  • কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে শর্করা স্মৃতিশক্তি বাড়াতে এবং দুরুহ কাজ করার ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
  • ডার্ক চকোলেটের মতো বেশ কিছু ডেজার্টে থাকে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট এবং কোকো। যা স্ট্রোকের সম্ভাবনা কমায়।, সকালে নাস্তায় মিষ্টি খেলে সারাদিন কম খাদ্য গ্রহণ ও শর্করা ক্রেভিং কমে,ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে, মিষ্টি দারুণ ভূমিকা পালন করে।

মিষ্টির অপকারিতাঃ

  • দুধ/ছানা ছাড়া শুধুমাত্র চিনি/গুড়ের তৈরি মিষ্টি শর্করা সমৃদ্ধ এবং সম্পূর্ণ ক্যালরী শর্করা হতে আসে এই প্রকারের মিষ্টি স্বাস্থ্যকর নয়।
  • অতিরিক্ত পরিমাণে মিষ্টি খাওয়া কখনোই শরীরের পক্ষে ভাল নয়। অতিরিক্ত পরিমাণে মিষ্টি খাওয়ার ফলে শরীরে বাড়তি মেদ জমে যা ভবিষ্যতে নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় যে কোন খাবার শরীরে ফ্যাটের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে অনেকটাই।
  • একাধিক গবেষণার ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোন এক দিনের খাবারে যদি ১৫০ গ্রামের বেশি ফ্রুকটোজ থাকে, তাহলে তা উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
  • শুধু সুগারের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় এটা বলা যায় না।গবেষকরা বলছেন যে উচ্চ ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের সাথে উচ্চমাত্রায় শর্করাসমৃদ্ধ খাবার খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
  • উচ্চ মাত্রার ফ্রুকটোজ সমৃদ্ধ কর্ন সিরাপ বা বাড়তি চিনিওয়ালা পানীয়, জুস ড্রিংক, মধূ, বা সাদা চিনি এগেুলো হৃদযন্ত্রের সমস্যা তৈরি করতে পারে, কারণ তা ধমনীর ভেতর ট্রাইগ্লিসারাইডজাতীয় চর্বি জমাতে ভুমিকা রাখে।
  • মিষ্টি তৈরির সময় অতিরিক্ত চিনি যোগ করা হয়। বিভিন্ন জরিপে এই বাড়তি যোগ করা চিনিসমৃদ্ধ খাবার বা পানীয়ের সাথে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার সম্পর্ক দেখা গেছে।
  • আমরা স্বাস্থ্যকর ফল – যাতে শর্করা আছে – তার সাথে কোমল পানীয়কে গুলিয়ে ফেলছি, যাতে বাড়তি শর্করা ছাড়া কোন পুষ্টিকর উপাদান নেই। কিছু জরিপে বলা হয়, যারা বেশি বেশি কোমল পানীয় বা ফলের রস খান তাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল, মস্তিষ্কের গড় আয়তনও কম।
  • কিছু মিষ্টি তৈরিতে কৃত্রিম রং ব্যবহৃত হয় যা ক্যান্সার এর ঝুঁকি বাড়ায়।

গ্রহনের পরিমাণঃ

The National Academy of Sciences, মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ঠিক রাখতে দৈনিক ১৩০ গ্রাম (৫২০ ক্যালোরি) শর্করা গ্রহণের পরামর্শ দেয়। যা মস্তিষ্কের দৈনন্দিন গ্লুকোজ তৈরি করার জন্য ন্যূনতম পরিমাণ শর্করা। প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মোট ক্যালরির ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ শর্করা থেকে গ্রহণ করা উচিত। অনেক পুষ্টিবিদদের মতে মোট ক্যালরির শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ কার্বোহাইড্রেট হতে গ্রহণ করা জরুরি। তবে কোনোভাবেই শতকরা ৭০ ভাগের বেশি ক্যালোরি কার্বোহাইড্রেট হতে গ্রহণ করা যাবে না। তবে কার্বোহাইড্রেট এর কিছু অংশ মিষ্টি থেকে এবং কিছু অংশ প্রাকৃতিক উৎস যেমন শর্করা সমৃদ্ধ ফল হতে গ্রহন করা ভাল। খাদ্য বিশেষজ্ঞ রেনি ম্যাকগ্রেগর বলছেন, আমাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই সুষম খাবারের সংজ্ঞা ভিন্ন ভিন্ন। তাই ব্যক্তিবিশেষ মিষ্টিজাতীয় খাবার বা কার্বোহাইড্রেট এর চাহিদা ও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। দেখা গেছে, যারা এ্যাথলেট বা ক্রীড়াবিদ – তারা বেশি শর্করা খেলেও শারীরিক পরিশ্রম বেশি করছেন বলে তা হজম হয়ে যাচ্ছে – কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে না। খাদ্যতালিকা থেকে চিনিকে বাদ দিয়ে দেয়াটা বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। এমন হতে পারে চিনি বাদ দিয়ে হয়তো অতিরিক্ত ক্যালরিসমৃদ্ধ কোন খাদ্য বেশি খেতে শুরু করলেন, তাতে ক্ষতিই বেশি। দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী পরিমানমত চিনি/ মিষ্টি জাতীয় খাবার খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।

পরামর্শঃ

উচ্চরক্তচাপ ,ডায়বেটিস ও হৃদরোগীদের মিষ্টি পরিহার করা উচিত । তবে ,রক্তচাপ কমে গেলে ও ডায়বেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেকসময় কমে যায় ,এই অবস্থায় পরিমিত পরিমাণে মিষ্টি খেতে পারবে। শারীরিক/কায়িক পরিশ্রমী লোকদের জন্য শক্তির ভালো উৎস মিষ্টি। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের অধিক পরিশ্রমী পেশাজীবীদের চাহিদা পূরণে মিষ্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *