ভিটামিন ডি

Vitamin-D

ভিটামিন ডি ফ্যাট সলিউবল (তেল বা চর্বি দ্রবীভূত) ভিটামিন। এটি দেহে ক্যালসিয়াম পরিশোষনে ভূমিকা রাখে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্রিয়ায় ত্বকে উপস্থিত sterols হতে ভিটামিন ডি উৎপন্ন হয়। তাই একে সানশাইন ভিটামিন বলা হয়। সূর্য রশ্মির শক্তিশালী রিকেট বিরোধী ভূমিকা রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি গ্রহণে রিকেট রোগ নিরাময় হয়। তাই ভিটামিন ডি রিকেট বিরোধী ভিটামিন হিসেবে পরিচিত।

ভিটামিন ডি এর রাসায়নিক ধর্ম

  • দুটি জৈবিক প্রাক ভিটামিন(৭-ডি হাইড্রো কোলেস্টেরল এবং এরগো স্টেরল) হতে ভিটামিন ডি তৈরি হয়।
  • সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির উপস্থিতিতে ৭- ডি হাইড্রো কোলেস্টেরল, ভিটামিন ডি 3 (কোলেক্যালসিফেরল) এবং এরগোস্স্টেরল, ভিটামিন ডি2 (এরগোক্যালসিফেরল) এ পরিণত হয়।
  • বিশুদ্ধ ভিটামিন গুলো সাদা, গন্ধহীন স্ফটিকাকার যা চর্বি দ্রবণীয়।এই ভিটামিন চর্বিতে দ্রবণীয় কিন্তু পানিতে অদ্রবণীয়।
  • বায়বীয় জারনে স্থিতিশীল।
  • মাঝারি তাপ এবং অ্যালকালাইন সলিউশন নিরপেক্ষ।
  • ভিটামিন ডি তেল বা চর্বি দ্রবণে দীর্ঘসময় স্থিতিশীল কিন্তু খনিজ লবণের উপস্থিতিতে অস্থিতিশীল হয়।

ভিটামিন ডি এর উৎস

প্রচলিত খাদ্য হতে খুব অল্প পরিমাণ ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।

  • ডিমের কুসুম ভিটামিন ডি-এর খুব ভালো উৎস। তবে তা মুরগির খাদ্যের ধরনের ওপর নির্ভর করে।
  • তেল বা চর্বিযুক্ত মাছ, সামুদ্রিক মাছ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন ডি সরবরাহ করে।
  • মাছের কলিজা এবং মাছের কলিজার তেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।
  • বনস্পতি ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ করণ করা হয়। ফলে বনস্পতি তে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।
  • সূর্য রশ্মি হতে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।
  • তবে, দুধ ভিটামিন ডি এর ভালো উৎস নয়। দুধে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। রোদে চরে বেড়ায় এমন গরুর দুধে অল্প পরিমাণে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।

ভিটামিন ডি শোষণ এবং বিপাক

ভিটামিন ডি তেল বা চর্বি জাতীয় পদার্থের সাথে শোষিত হয়। Chylomicrons (এক ধরনের লিপোপ্রোটিন ) এর সাথে যুক্ত হয়ে লসিকাতন্ত্র প্রবেশ করে এবং রক্তে নির্দিষ্ট বাইন্ডিং প্রোটিন এর সাথে যুক্ত হয়ে লিভারে পৌঁছায়। বেশিরভাগ ভিটামিন ডি লিভারে সঞ্চিত হয় এবং ধীরে ধীরে পরিপাক হয়। এই ভিটামিন শোষণে পিত্তরস অপরিহার্য। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন শরীরে জমা থাকে।

ভিটামিন ডি এর কাজ

সকল প্রকার প্রাণীর দেহ গঠনের জন্য ভিটামিন ডি এর প্রয়োজন। দেহে ভিটামিন ডি-এর বহুবিধ কাজ রয়েছে-

  • পরিপাককৃত খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম শোষণ।
  • অস্থি ও দৈহিক কাঠামোর গঠন ও বৃদ্ধি সুসম্পন্ন করে এবং দেহের সার্বিক গঠন নিয়ন্ত্রণ করে।
  • ভিটামিন ডি ক্ষুদ্রান্ত্র হতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের শোষণ বৃদ্ধি করে।
  • ভিটামিন ডি রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এদের ভিতর থিতানো সম্ভব করে।
  • এছাড়া ফসফেটজ এনজাইমকে সক্রিয় রাখার মাধ্যমে এই ভিটামিন অস্থি গঠনের জটিল প্রক্রিয়া টি চালু রাখে।
  • ভিটামিন-ডি অস্থির গঠন স্বাভাবিক ও সম্পূর্ণ করে।
  • অস্থির গঠনের সময় লম্বা অস্থির প্রান্তে অস্টিওব্লাস্ট নামক অস্থি সৃষ্টিকারী কোষসমূহের সৃষ্টি হয়, ভিটামিন ডি এদের পূর্ণ অস্থিতে পরিবর্তিত করে।
  • ভিটামিন ডি কিডনিতে ফসফেট সমুহকে পুনরায় শোষণ করে, রক্তে এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
  • ভিটামিন ডি তরুণাস্থির মুক্ত অ্যামাইনো এসিডের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।
  • এই ভিটামিনের উপস্থিতিতে পরিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি পায়। শক্তির প্রয়োজনে অথবা রাসায়নিক যৌগ সমূহের প্রয়োজনে যে কারণেই হোক ভিটামিন-ডি সাধারণভাবে মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে।

অভাবজনিত লক্ষণ

ভিটামিন ডি এর অভাবে এর শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ ব্যাহত হয়। ফলে

  • শিশুদের মধ্যে রিকেট এবং বড়দের বা প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে অস্টিওম্যালেসিয়া নামক রিকেট দেখা দেয়।
  • হাড় গুলো নরম হয়ে যাওয়ায় দেহের ওজনের চাপে কঙ্কালে গঠনগত ত্রুটি দেখা দেয়।
  • শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং হাড় বা মাথার খুলি নরম হয়ে যায়, পায়ের হাড় গুলো ধনুকের মতো বেঁকে যেতে পারে।
  • রক্তে ফসফরাস ও ক্যালসিয়ামের অভাবে মেরুদন্ড দুর্বল হয়ে মেরুদণ্ড বাকা হয়ে যাওয়া, কব্জি ফোলা ভাব, হাঁটু এবং গোড়ালির জয়েন্ট গুলো ফুলে যাওয়া, পেশির দুর্বলতা, অস্থিরতা, ভয় বা স্নায়বিক উত্তেজনা এমন আরও কিছু লক্ষণ দেখা যায়।
  • মল বা মূত্রের সাথে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস বের হয়ে যায়।
  • দাঁত দুর্বল হয়ে যায়।
  • রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের পরিমাণ এত কম হয় যে এরা জমাট বেধে অস্তিতে সঞ্চিত হতে পারে না ফলে অস্থি নরম হয়ে বেঁকে যায় এবং এর প্রান্ত ভাগের তরুণাস্থি গুলি শুধু বাড়তেই থাকে।

ভিটামিন ডি এর অভাব যাদের হয়

সাধারণত যারা নিরামিষভোজী, দীর্ঘদিন যাবৎ মদ্যপানে অভ্যস্ত , যারা সম্পূর্ণ দেহ আবৃত করে রাখে ফলে সূর্যের আলো পায় না এমনকি পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করে না, তাদের ভিটামিন ডি এর অভাব দেখা দেয়।

ভিটামিন ডি গ্রহণের পরিমাণ/ চাহিদা

ভিটামিন ডি এর দৈনিক চাহিদা ৪০০ I.U. বা ১০ mg কোলেক্যালসিফেরল। সূর্যের আলো ভালো এমন দেশগুলিতে ভিটামিন ডি এর জন্য সুপারিশ কৃত পরিমাণ ২০০ I.U. বা ৫ mg কোলেক্যালসিফেরল।

ভিটামিন ডি এর বিষাক্ততা (Hypervitaminosis)

ভিটামিন ডি ওভার ডোজ এর ফলে দেহে মারাত্মক বিষাক্ততা সৃষ্টি হয়। ফলে:

  • ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অতিরিক্ত বিশোষণ হয়।
  • রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা বৃদ্ধি পায় ফলে দেহের সকল কোষ সমূহে খনিজ লবণ জমতে থাকে। যার দরুন বৃক্ক বা কিডনিতে পাথর হতে পারে।
  • ক্ষুধামন্দা , ক্লান্তি , ওজন কমে যাওয়াপলিইউরিয়া
  • হৃদপিণ্ড, রক্ত-নালী, ফুসফুস ও কিডনীর নলগুলির নরম টিস্যুগুলিতে ক্যালসিয়াম জমে নালী গুলো সরু হয়ে যায়।
  • রেনাল ড্যামেজ হতে পারে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *